অত্যন্ত পরিতাপ ও লজ্জার বিষয়, ৫৬ হাজার বর্গমাইল জুড়ে যেন ধর্ষণের উৎসব, নারীর চিৎকার, শিশুর চিৎকার, মায়ের কান্না, অসহায় বাবার কলিজাফাটা আর্তনাদ। অথচ দেশের প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় সংসদের স্পিকার, বিরোধীদলীয় নেতা সবাই নারী, সে দেশে এমন একেরপর এক ঘটনা! এ লজ্জা আমরা রাখবো কোথায়? এ লজ্জা কি বেগমগঞ্জের সেই নির্যাতিত মায়ের, নাকি সমগ্র দেশবাসীর?
নির্মম, বীভৎস, ভয়ানক কোনো বিশেষণ দিয়েই বেগমগঞ্জের এ ঘটনার বর্ণনা করা যায় না। একদল হিংস্র দুর্বৃত্তের ভয়াল থাবা, বর্বর উল্লাসের সঙ্গে মিশে ছিল অসহায় এক নারীর বুকফাটা আর্তনাদ। দুর্বৃত্তদের বারবার ‘বাবা’ ডেকে সল্ফ্ভ্রম ভিক্ষা চেয়েছিলেন। শরীরটাকে ঢেকে রাখার প্রাণপণ লড়াই করেছেন। ‘মাফ করে দেন, আমি বাচ্চার মা’। এই শুনে আসমান কেঁপে যাচ্ছে, কিন্তু সেই পাষাণদের মন ছিল অবিচল। বেগমগঞ্জের সেই নারী, সেই মা, সেই স্ত্রী নির্যাতকদের পায়ে পায়ে ঘুরে বলছে, ‘আমার মেয়েটা ছোট, ওরে অন্তত ছেড়ে দ্যান’। পাড়া-প্রতিবেশী তখন দুয়ার আটকে চুপ! ফেসবুকে যখন ‘চ্যালেঞ্জিং টাইমসের’ সেলিফসহ কতরকম চ্যালেঞ্জের মচ্ছব, তখন হায়েনার দল নারীমাংস ছিঁড়ে খাচ্ছে আর উল্লাস করছে। মরবার আগ পর্যন্ত মানুষ বাঁচার চেষ্টা করে। বাঁচার চেষ্টায় ওই নারী কিনা করে গেলেন। আজ বেগমগঞ্জ, গতকাল সিলেট, তার আগে খাগড়াছড়ি, তার আগে খুলনা, তার আগে বগুড়া, সাভার কোথায় না? অথচ রাজধানী কত স্বাভাবিক। ‘চলো বন্দু ঘুরে আসি’ মেজাজে চলছে সবকিছু।
সেই রাতে যা ঘটে: নির্যাতিত নারী অভিযোগ করেছেন, স্বামীর অনুপস্থিতিতে একই গ্রামের বাদল, সাইফুল, সুমন, আবুল কালামসহ দুর্বৃত্তরা তাকে দফায় দফায় অনৈতিক প্রস্তাব দিয়ে আসছিল। তিনি তাদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় বাদল ও তার লোকজন ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। প্রায় রাতেই তারা ঘরের চারপাশে ঘোরাফেরা করত এবং গভীর রাতে দরজায় টোকা দিত। দীর্ঘদিন পর গত ২ সেপ্টেম্বর রাত আনুমানিক ১০টার দিকে তার স্বামী ঘরে প্রবেশ করেন। এর কিছুক্ষণ পরই বাদলের নেতৃৃত্বে ৪০-৫০ জন তার বসতঘর ঘিরে রাখে। এক পর্যায়ে দরজার কড়া নাড়লেও তিনি দরজা খোলেননি। এতে বাদল ও তার লোকজন লাথি দিয়ে দরজা ভেঙে ১৬-১৭ জন ঘরের ভেতর প্রবেশ করে। এ সময় তার স্বামীকে মারধর করে পাশের একটি কক্ষে নিয়ে আটকে রাখে। এরপর বাদল, রহিম, সাইফুল ও সুমন তার ওপর বীভৎস নির্যাতন চালান। তার চিৎকারে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এলেও দুর্বৃত্তদের ভয়ে কেউ কাছে আসতে সাহস পাননি। নির্যাতনকারীরা চলে যাওয়ার সময় এ ঘটনা কাউকে বললে ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে যায়।
৩২ দিন আগের ঘটনা তারা ভিডিও করে রেখেছিল এই উদ্দেশ্যে, ওই ভিডিও প্রকাশের হুমকি দিয়ে ওই নারীকে দাসী বানিয়ে রাখবে, চাহিবা মাত্রই তাকে নির্যাতনের মওকা মেলাবে। ভিডিও ভাইরাল হয়েছে বলে চার নির্যাতক গ্রেপ্তার হয়েছে। সিলেটের ঘটনায় নির্যাতিতা নারী সাহস করে থানায় গেছেন বলে পুলিশ নড়তে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু ক্যামেরার চোখের বাইরে, লোকচক্ষুর অন্তরালে, আরও বড় বড় লোকের দ্বারা যেসব অনাচার ঘটে, সেসবের কী হবে? দেখছি না বলে সেগুলো ঘটছে না?
বেগমগঞ্জর নির্যাতিতা নারীর ভিডিও আমাদেরও দেখতে বাধ্য করা হয়েছে। আমি দেখিনি, যাঁরা দেখেছেন তাঁদের রাগ-ক্ষোভ-হতাশা দেখেছি। যদি আমরা এ রকম আরেকটি ঘটনা ঠেকাতে না পারি, যদি আবারও আমাদের মানবতার সেই দোমড়ানো-মোচড়ানো, ছিন্নভিন্ন দেহ দেখতে বাধ্য করা হয়, অক্ষমতার পাপে কিংবা অনুশোচনার বিষে আমরা আমাদের কী শাস্তি দেব? কী জবাব দেবেন বেগমগঞ্জের গ্রামবাসী, যাঁরা নির্যাতিত নারীর আর্তনাদ শুনেও লুকিয়ে ছিলেন দূরে?
সরকারের নারীর ক্ষমতায়নের টার্গেটের সঙ্গে আইনের শাসনের নিশ্চয়তা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। নারীরা যদি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে তাহলে ক্ষমতায়ন বিষয়টি হয়ে যায় হাস্যকর। বেগমগঞ্জে যেসব পুরুষ নামক হিংস্র প্রাণী এমন জঘন্য ঘটনাকে আনন্দ উল্লাসের মাধ্যমে ভিডিও করে ফেসবুকে প্রচার করেছে তাদের মানসিকতাকে আমলে নিতে হবে। তাদের এই সাহসের উৎসকে যদি আমলে না নেওয়া হয় তাহলে এমন অপরাধ ঘটতেই থাকবে। প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো অপরাধীরা বেড়ে ওঠে প্রশাসনেরই আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে। ধর্ষণকে নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে একটাই উপায় আছে আর তা হচ্ছে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা। প্রচলিত আইনের সকল সীমাবদ্ধতাকে কাটানোর জন্য পদক্ষেপ নেওয়া এবং ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদন্ড রেখে আইনের সংশোধন করা।
লেখক-
মোঃ মনির হোসেন
সাংবাদিক ও কলামিস্ট
সিনিয়র সহ-সভাপতি, ফতুল্লা রিপোর্টার্স ক্লাব।
আপনার মন্তব্য প্রদান করুন...