রণজিৎ মোদক : “সুবচনী যে বাড়িতে যায়। সে বাড়িতে গুয়ামুরি তেল সিন্দুর পায়।” সু-মানে সুন্দর, বচন-মানে কথা। যার মুখের বাণী সুন্দর তাকে তো সবাই আদর যত্ন করবেই। মুখের ভাষা বা কথা যার কর্কশ তার সাথে মানুষের মধুর ভাব থাকেনা। সুজনে সুযশ গায় কুযশ নাশিয়া। আর কুজনে কুজনে গায় সুযোগ তাকিয়া। আজ সুবচনের নির্বাসন হয়েছে। স্বার্থ ছাড়া মানুষ অন্য কিছুই ভাবতে পারছেনা। এজন্য কাকে দোষারোপ করব ভাবতে পারছিনা। সমাজ চিন্তাবিদরা বলতে পারবেন।
অনেকে বলেন, চাচা আপন প্রাণ বাঁচা। পরিবেশ-পরিস্থিতি সব পাল্টে দিচ্ছে। পরাধীন জাতির মধ্যে ঐক্য সহমর্মিতা ছিল। স্বাধীনতা লাভের পর থেকে একটা শ্রেণি রাতারাতি রং পাল্টাতে লাগলো। অফিস-আদালত, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সুবচনে তেমন কোন কাজ হচ্ছে না। মানে টাকাই হচ্ছে সব। টাকা ছাড়া কিছু আশা করা যাচ্ছে না। মনের দুঃখে আজ সুবচনী মা, মান কচুবনে আশ্রয় নিয়েছেন।
এক সময় গাঁ গ্রামে বাইক কাঁদে অর্ধ বয়স্ক বৃদ্ধ বয়সী দরিদ্র লোক সুবচনী-মঙ্গলচন্ডীর নামে মাগন তুলে জীবিকা নির্বাহ করত। বাইগের সামনে ছোট্ট চারকানী বিশিষ্ট মোটা কাপড়ের ঘর। এই ঘরের ভিতরে সিঁদুর রাঙানো সুবচনী-মঙ্গলচন্ডী জবা ফুলে সাজিয়ে বাড়ি বাড়ি সুবচনী-মঙ্গলচন্ডীর গীত গেয়ে মাগন মাখতো। গৃহবধূরা তাদের স্বামী সন্তানের মঙ্গল কামনায় তেল সিঁদুর দিয়ে মায়ের চরণে প্রার্থনা করতেন। গ্রামের ছোট-ছোট ছেলে-মেয়েরা সেই বৃদ্ধের পিছে বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়াতো। আর সুবচনী মঙ্গলচন্ডীর গীত শুনতো। সুবচনী মঙ্গলচন্ডী যার বাড়িতে যায়। সেই বাড়িতে পান গুয়া পায়। স্নান করিয়া যেই নারী মুখে দেয়গো পান, লক্ষী বাইগান উইটা বলে সেই নারী আমার সমান।
হিন্দু সনাতনী শাস্ত্রমতে, সুবচনী-মঙ্গলচন্ডী আত্মশক্তি যোগমায়ার শ্রীশ্রী দুর্গা রূপ। রাজা-জমিদার একসময় রাজ্যের মঙ্গলের জন্য দুর্গাপূজা করতেন। রাজতন্ত্র বিদায় নেওয়ার ধর্নাঢ্য বণিক শ্রেণি দুর্গাপূজা করতেন। পরবর্তীতে বারোয়ারি সর্বজনীন পূজার প্রচলন হয়। বর্তমানেও সেই দুর্গাপূজা হচ্ছে। এই পূজা অনুষ্ঠান দেখতে অনেক দর্শকের ভিড় হয়। দুর্গা মাকে দেখতে পায় কিনা জানিনা। তা অনেকেই পূজার প্যান্ডেল দেখে বা দেখায় বাহবা কুড়িয়ে থাকেন। সনাতনী মতে ক্ষুদ্র পরিসরে দুর্গাপূজার বিধান প্রচলিত রয়েছে। যেকোনো শুভ কাজ বিশেষ করে ছেলে-মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানের পূর্বে ছেলেপক্ষ আর মেয়ে পক্ষ পৃথক পৃথক ভাবে সাজিয়ে মাটির মধ্যে শব্দ নদীর ধারে সুবচনী মঙ্গলচন্ডী শিলা দুধ সিন্দুর দিয়ে সধবা কুল বধুয়া পূজা করেন। প্রার্থনা করেন নবদম্পত্তির সংসার সুখের হোক। সন্তান-সন্তুতি জন্মের পর জননা অসুস্থ নিভৃত হলে সুবচনী-মঙ্গলচন্ডী পূজা করা হয়।
তাছাড়া এ পূজায় পান সুপারি আটি কলা ও ফলমূলই যথেষ্ট। এ যেন গরীবের দুর্গাপূজা। স্থান কাল-পাত্রভেদে এখনো সুবচনী মঙ্গলচন্ডী পূজার প্রচলন রয়েছে। পৌরাণিক আর লৌকিকতার মধ্যে সবকিছুই হারিয়ে যাচ্ছে। গত ৪০ বছর পূর্বের সেই বাইক কাঁদে অর্ধ বয়সী বৃদ্ধদের সুবচনী মঙ্গলচন্ডী নিয়ে গাঁয়ে-গাঁয়ে ঘুরতে আর দেখা যায় না। স্বার্থান্বেষী সমাজ আর সমাজপতিদের কাছে সুবচন নীতিকথা আজ মূল্যহীন হয়ে যাচ্ছে। যার ফলে সমাজের উন্নয়নের সিড়ি গুলো পিচ্ছিল রূপ নিচ্ছে। অবক্ষয় হচ্ছে নীতি-নৈতিকতার। মান কচুবন থেকে সুবচনীকে উদ্ধার করে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে সমাজের মঙ্গল কামনায়।
লেখক –
রণজিৎ মোদক
শিক্ষক, সাংবাদিক ও কলামিষ্ট।
আপনার মন্তব্য প্রদান করুন...