মোঃ আল-আমিন : প্রশ্নটা পুরানো। আগেও বহুবার এই প্রশ্ন সামনে এসেছে বিচ্ছিন্নভাবে। প্রশ্নটা অনেকের। সেটাই উঠে এসেছে এই প্রতিবেদকের অনুসন্ধানে। ইতিহাস কখনোই মুছে ফেলা যায় না। বাংলাদেশে ইতিহাস মুছে ফেলার, ইতিহাস বিকৃতির অপচেষ্টা হয়েছে যুগে যুগে। কিন্তু সেই প্রচেষ্টা সফল হয়নি কখনো। ইতিহাস বিকৃতি বা ইতিহাস মুছে ফেলার পিছনে রাজনৈতিক স্বার্থ থাকে। কিন্তু বক্তাবলীতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের কিছু অংশ বাদ দিয়ে কিছু অংশকে ধারণ করে নতুন প্রজন্মের কাছে খন্ডিত ইতিহাস তুলে ধরার পিছনে কোনো স্বার্থ নেই। তবুও মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বক্তাবলী পরগণার কুড়েরপাড় গ্রামে আরো একটি হত্যাকান্ডের ইতিহাস আড়ালে রয়ে গেছে বলে দাবি করেছে আলীরটেক ইউনিয়নের তরুণ সমাজ। এর প্রকৃত কারণ জানে না কেউ।
বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরীর মোহনার তীর থেকে পরগণার সীমানা শুরু হয়েছে। তবে মূল ভুখন্ডটি মূলতঃ ধলেশ্বরী নদীর তীরে অবস্থিত। একাত্তরে স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে এই অঞ্চলটি মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে “সেইফ জোন” হিসেবে চিহ্নিত ছিলো। এখানে অবস্থান করে পাকবাহিনীর সাথে যুদ্ধ চালানো সহজ ছিলো। পাক বাহিনী এ বিষয়ে অবগত হয়েছিলো বিধায় এই অঞ্চলে অভিযান চালিয়ে নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালায়। ২৯ নভেম্বর ১৯৭১ সালে চালানো এই হত্যাকান্ডে ১৩৯ জন নিরীহ মানুষ শহীদ হয়েছে বলে কথিত আছে। এটা সকলেই জানে। কিন্তু ইতিহাসের এই প্রান্তরে দাঁড়িয়ে আরেকটি রক্তাক্ত ইতিহাসকে কালের ধূলায় মুছে যেতে দেওয়া যায় না। ২৯ নভেম্বরের আগে বর্ষাকালে কুড়েরপাড়ে একদিন পাকবাহিনীর আক্রমণে বহু হতাহতের ঘটনা ঘটে। সেই ইতিহাস রয়ে গেছে মানুষের অজানা। “ইতিহাস কখনোই মুছে যায় না” বাক্যটি সবখানে উচ্চারিত হতে দেখা যায়। তাহলে এই পরগণার একটি বেদনার্ত ইতিহাস কি করে আমাদের স্মরণের বাইরে থাকে? প্রশ্ন সচেতন এলাকাবাসীর।
কুড়েরপাড়ের বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম জানিয়েছেন ২৯ নভেম্বর ১৯৭১ সালে এই পরগণা জুড়ে নির্মম হত্যাযজ্ঞ ছাড়াও বর্ষাকালে আরো একটি হত্যাকান্ড চালিয়েছিলো কুড়েরপাড়ে। বেশ কয়েকজন লোককে হত্যা করেছে। এর মধ্যে রশিদ মাদবরের ছেলে সানাউল্লাহ, আহমদ আলীর ছেলে ছাত্তার, গিয়াসউদ্দিনের বাবা নুরুল ইসলাম। এছাড়া বেশ কয়েকজন আহত হয়েছে। তাহলে এই দিনটির কথা কেনো জানে না বর্তমান প্রজন্মের কেউ এমন প্রশ্নের জবাবে কোনো সদুত্তর দিতে পারেন নি তিনি।
এদিন যারা শহীদ হয়েছে তাদের ঠাঁই হয়নি এই অঞ্চলের ইতিহাসের পাতায়। এই কুড়েরপাড় আমাদের অঞ্চলের একটি গ্রাম। এই রক্তাক্ত অধ্যায় আমাদের জন্মের ইতিহাস। এই ইতিহাস ব্যতিরেকে এই অঞ্চলের ইতিহাস পূর্ণতা পাবে না। ঐদিনের আক্রমণে যারা শহীদ হয়েছিলো, যারা আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলো তাদের রক্ত এই দেশের পবিত্র মাটিতে মিশে আছে। এ ঋণ শোধ হবে না বলে অভিব্যক্তি প্রকাশ করেন কয়েকজন তরুণ।
এই বিষয়টা নিয়ে প্রায় কয়েকবছর আগে থেকে কুড়েরপাড়ের আল-আমিনের উদ্যোগে হারুন, ইমতিয়াজ, মহসিন, সাইফুল নামে কয়েকজন কাজ শুরু করে। অনলাইন অফলাইনে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয়। ক্রোকের চরের তথ্য সংগ্রহের কাজও শুরু হয়। কিন্তু কাজটি আজও শেষ করা যায়নি। যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া হলেও সার্বিক সহযোগিতার অভাবে ইতিহাসের এই অজানা অধ্যায়কে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা এখনো সম্ভব হয়নি। অনেকে সহযোগিতার কথা বললেও প্রয়োজনের সময় পাশে থাকেনি। তাই আলীরটেক ইউনিয়নের আরো বেশ কয়েকজন সচেতন তরুণের উদ্যোগে পুনরায় শহীদদের পূর্ণাঙ্গ তথ্য ও ইতিহাসের অজানা অংশটিকে আগামী প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে তথ্য সংগ্রহ করা হবে।
এই অঞ্চলের সামাজিক বন্ধন খুবই দৃঢ়। এই এলাকার মানুষের পরস্পরের সাথে আন্তরিক সম্পর্ক বিদ্যমান। প্রায় সবাই আত্মীয়তার সম্পর্কে আবদ্ধ। সবাই সবার খবর জানে। এক গ্রামের কোনো ঘটনা সম্পর্কে আশেপাশের গ্রামের মানুষও অবগত। তাই এই তথ্য সংগ্রহ করা খুবই সহজ হবে বলে মনে করে উদ্যোগী তরুনরা। শাহিন রাজু মেম্বার, শফিকুল ইসলাম বিপ্লব, দিদার হোসেন ও আল-আমিন নামে এই চারজনের সাথে কথা বলে জানা যায় তারা বিষয়টি নিয়ে জোরালোভাবে কাজ করে যাচ্ছে। আলীরটেক ইউনিয়নের শহীদ, যুদ্ধাহত, ধর্ষিতদের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে বই আকারে প্রকাশেরও আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করা হয়।
এই এলাকার গৌরবময় ইতিহাস মুছে যেতে পারে না। আমাদের বক্তাবলী পরগণার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের যে বিশাল আকাশ আছে সেখান থেকে কোনো অংশ উল্কার মতো বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে না। আমরা সেটা হতে দিবো না। এমন প্রত্যয় ব্যক্ত করে সকলের আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করেছেন উদ্যোগী তরুনরা।
আপনার মন্তব্য প্রদান করুন...