তুষার আহমেদ : আব্দুল গনি মিয়া। আশিতে পা দেয়া এই বৃদ্ধের জীবনে রয়েছে নানা চড়াই-উৎরাই। বয়স স্বল্পতায় ৫২’র ভাষা আন্দোলনে যোগ না দিলেও তা পরখ করেছেন। ৭১’রে ছিলেন তাগড়া যুবক। তাই পাকিস্তানীদের বিতারিত করে দেশ স্বাধীন করতে অস্ত্র হাতে নিয়েছেন। হ্যা… মুক্তিযোদ্ধা তিনি।
যুদ্ধের মাঠে শক্তিশালী শত্রু বাহিনীর আতঙ্ক তাকে দমাতে পারেনি। দেশ প্রেমে ডর-ভয়হীন এই যোদ্ধা দেশ স্বাধীনের পর ধ্বংসস্তুপ এক বাংলাদেশ পেলেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়ে আস্থা রেখেছিলেন। সংসারের ঘানি টেনে যাওয়া এই ব্যক্তিটি অন্তত দু’মুঠো খাবার যোগার করেছিলেন। আজ ৮০তে পা রেখেও সংসারের ঘানি টেনে যাচ্ছেন, টেনে যেতে হবে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত। তার দুই অকৃতজ্ঞ সন্তান বিয়ে করে স্ত্রী নিয়ে যার যার মত আলাদা সংসার পেতেছেন। বৃদ্ধ বাবা-মায়ের খোঁজ নেয়ার প্রয়োজন টুকুও মনে করেন না তারা। তাই সহধর্মীনিকে নিয়েই ছোট্ট সংসার গনি মিয়ার।
বয়সের ভারে এখন আগের মত শরীর চলেনা। দিন মজুরের শক্ত কাজ এখন আর করা হয়না। কিন্তু ছোট্ট এই সংসারতো আর বয়স বুঝবে না। তাই দু’মুঠো ভাত যোগাতে দিনভর পায়ে হেটে ফেরি করে চা-বিস্কুট বিক্রি করেন গনি মিয়া। নিতান্তই গরিব হলেও আত্মসম্মানবোধ রয়েছে বেশ। তাইতো ফেরি করে চা-বিস্কুট বিক্রির সামান্য টাকা দিয়েই কোন ভাবে খেয়ে-পুরে রয়েছেন। হাত পাতেননি কারো দুয়ারে।
কিন্তু জীবনের এই শেষ বেলায় এসে আজ হতভম্ব তিনি! পেট বাঁচাবার এই ক্ষুদ্র ব্যবসাও যে আজ বন্ধ হয়ে পরেছে। প্রাণঘাতী নভেল করোনা ভাইরাসের কবলে দেশের এই ক্রান্তিকালে তার ক্ষুদ্র ব্যবসাতেও ভাটা পরেছে। নিরাপত্তার জন্য বাইরে বেড় হওয়া বারণ। মাঝে কয়েকবার বের হলেও বিক্রি একে বারেই নেই। রাস্তায় মানুষ নেই। পথচারি কেউ থাকলেও সচেতনতার জন্য রাস্তার চা খাওয়াইযে বাদ দিয়েছেন সকলে! তাহলে বিক্রি হবেই বা কি করে? কিন্তু সংসার ! সেকি বুঝবে এই সংকট? দিন এনে দিন খাওয়া এই ছোট্ট সংসারটিতে চাল-ডাল ফুরিয়েছে দু’দিন হলো। তাই বৃদ্ধা স্ত্রীকে নিয়ে না খেয়ে থাকার উপক্রম! এমন পরিস্থিতিতে যেন দুশ্চিন্তার মেঘ জমেছে চোখে মুখে। ঘরে ক্ষুধা, বাইরে করোনা আতঙ্ক ! এমন সংকটে নাকি স্বাধীনতা যুদ্ধেও পরতে হয়নি তাকে!
শনিবার (৪ এপ্রিল) দুপুরে এই প্রতিবেদককে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এমন কথা গুলোই জানিয়েছেন অসহায় গাণি মিয়া। তিনি বলেন, ‘আমার এই ৮০ বছরের এই জীবনেও এমন পরিস্থিতি দেখিনি। পাকিস্তান আমলে ৫২’র ভাষা আন্দোলন দেখেছি। ৭১’রে স্বাধীনতা যুদ্ধ করেছি। কিন্তু এমন সংকটে তখনও পরতে হয়নি। কারণ তখনতো কিছুনা কিছু করতে পেরেছি। আর এখন ঘর থেকেই বের হওয়া নিষেধ। বের না হয়েও উপায় নেই। ঘরেতো চাল-ডাল নেই।’
গনি মিয়ার স্থায়ী বাড়ি ময়মনসিংহে। দীর্ঘ বছর ধরে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানাধীন দক্ষিন সেহাচর এলাকার একটি বাড়িতে ভাড়ায় বসবাস করছেন।
এক প্রশ্নের জবাবে গণি মিয়া বলেন, আমার দুই ছেলে। তারা বিয়ে করে যার যার মত আলাদা রয়েছেন। বর্তমানে সংসারের সদস্য বলতে দু’জন, আমি ও আমার স্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘আমি পায়ে হেটে চা-বিস্কুট বিক্রি করে দিনে এনে দিনে খাই। কয়েকদিন ঘরে বসে ছিলাম। কিন্তু না খেয়ে থাকার উপক্রম হওয়ায় আজ চা নিয়ে বের হয়েছি। কিন্তু অন্যান্য দিনের তুলনায় বাইরে মানুষের চলাচল কম। কেউ চা খেতে চায় না। অনেকেই বলছে এখন বাইরের কোন খাবার খাওয়া যাবে না। সারাদিন এদিক সেদিক হেটে এক কাপ চা-ও বিক্রি করতে পারিনি।’
এক প্রশ্নের জবাবে গনি মিয়া বলেন, ‘ময়মনসিংহ থেকে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলাম। কিন্তু গেজেটভুক্ত হতে পারিনি। সরকারের মুক্তিযুদ্ধের ভাতাও পাইনি কোন দিন। এখন জানতে পেরেছি, সরকার বা বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকে ত্রাণ দেয়া হচ্ছে। কিন্তু কই? আমাদের এলাকায় (দক্ষিন সেহাচর) তো এগুলো দেখিনি। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে দেয়া হলেও কবে কখন বিতরণ করে সেটাওতো জানার ব্যবস্থা নেই।’
সমাজে এমন অসহায় গনি মিয়াদের সংখ্যা নেহাত কম নয়। তাই ঘরে ক্ষুধা ও বাইরে করোনার আতঙ্ক নিয়েই চরম সংকটে দিন কাটাচ্ছে এসব হতদরিদ্ররা। এই সংকট তাই বৃদ্ধ গনি মিয়াদের জন্য যুদ্ধের চেয়েও ভয়াবহ।
লেখক-
তুষার আহমেদ
নারায়ণগঞ্জ।
আপনার মন্তব্য প্রদান করুন...