মহালয় থেকে এসেছে মহালয়া। পিতৃপক্ষ এবং দেবী পক্ষের সন্ধিক্ষণ হচ্ছে মহালয়া।ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের প্রতিপদ থেকে অমাবস্যা। এ সময় কে পিতৃপক্ষ বলা হয়েছে। আশ্বিন মাসের কৃষ্ণপক্ষের শেষ হয়ে দেবী পক্ষের শুরু হয়। শুক্লা প্রতিপদ থেকে কোজাগরি পূর্নিমা পর্যন্ত হচ্ছে দেবী পক্ষ। মহালয়ায় পিতৃ তর্পণ করা হলে পিতৃ পুরুষ খুশী হয়ে আর্শিবাদ করেন। ধন জন ঐশ্বর্য্য ও দীর্ঘায়ু প্রাপ্ত হয়। মাতৃ পূজার সন্ধিক্ষণে ব্রহ্মার নির্দেশে পিতৃ পুরুষ মনুষ্য লোকের কাছাকাছি চলে আসেন। গোটা পক্ষকাল ধরে পিতৃ পুরুষের স্বরণ ও মননের মাধ্যমে তর্পণ করা হয়। এ সময় তর্পণ করতে না পারলে তারা দীপাবলির দিনও করতে পারেন। পিতৃ পুরুষের আত্মার প্রতি পিন্ডদান ও জল উৎসর্গ করা প্রয়োজন। বিষ্ণুকে উৎসর্গীকৃত প্রসাদ সেবন করার ফলে সমস্ত পাপ থেকে মুক্তি লাভ হয়। অবতার পুরুষ শ্রী রাম চন্দ্র তাঁর পিতা দশরথের মুক্তি জন্য যজ্ঞ তর্পণ করেন। পিতার প্রতি পুত্রের কর্তব্যের মধ্যে পিন্ডদান বিধেয়। যে পুত্র তার পিতৃ পুরুষের জন্য পিন্ডদান করেন না। সেই সংসারে নানা বিধ অমঙ্গল নেমে আসে।
জন্মান্তর ও কর্মবাদ গ্রন্থে উল্লেখ, দুজন পাপী বহু বছর যাবত নরক ভোগ করতে ছিলো। নারদমুনি বিষ্ণুর কথা মতো মর্তধামে এসে তাদের এক মাত্র কন্যা কে খুঁজে পান। সেই কন্যা বারবনীতার গৃহে অবস্থান করছে। সাধু বেশে নারদমুনি সেই মেয়ের নিকট তার পিতা মাতার উদ্দেশ্যে দান চাইলেন। পিতা মাতার কথা শুনে সেই মেয়ে রেগে বললেন আমাকে জন্ম দিয়ে তারা মারা গেছে। জন্মই আমার অপরাধ তাদের নাম আমার কাছে বলোনা। এভাবে সাধুকে ভিক্ষা না দিয়ে তাড়িয়ে দেয়। এক দিন নদীর ঘাটে স্নান কালে সাধু সেই মেয়েকে বললেন, মা তোমার বাবা মার উদ্দেশ্যে তিন অঞ্জলি জলই দাও। সাধুর কথায় সেই পতিতা মেয়ে তিন অঞ্জলি জল নদীর তীরে ফিকে দেয়। সেই নদীর ঘাটে জল সেবার জন্য কয়েক হাজার পিপিলিকা অপেক্ষা করছিল। সেই পিপিলিকা জল পান করে তারা সেখান থেকে চলে যায়। এতে সেই পাপীদ্বয় নরক যন্ত্রনা থেকে মুক্তি পেয়ে বিষ্ণু পদে লগ্ন হয়ে যায়।
পিতৃ পুরুষেরা অনেকেই অনেক সময় নানা রকম কর্মের ফলে পাপ ভোগ করেন। কেউ কেউ জড় দেহ পর্যন্ত ধারণ করতে পারেন না। সুক্ষদেহে প্রেতাত্মা রূপে থাকতে বাধ্য হয়। বংশের কেউ যদি তার পিতৃ পুরুষের উদ্দেশ্যে ভগবান প্রমাদ উৎসর্গ করে পিন্ডদান করেন। তখন আত্মার ভুতের দেহ দুঃখময় জীবন থেকে মুক্তি হয়ে শান্তি লাভ করেন।
যারা ভক্তি যোগের সাধন করেন তাদের এই অনুষ্ঠান করা প্রয়োজন নেই। শ্রীমদ্ভাগবতে (৭-১০-১৮) প্রহ্লাদ নৃসিংহ লীলায় ভগবান নৃসিংহদেব ভক্ত প্রহ্লাদের একুশ কূল উদ্ধার করেন। ভক্ত ভগবানের কাছে কিছু না চাইতেই ভগবান ভক্তকে তা দান করেন। ভক্তদের পিন্ডদান ও তর্পণ ক্রিয়ার প্রয়োজন নেই তবুও তাঁরা এ কাজ করেন, সমাজে দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্য। শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু যদিও তিনি ভক্তভাব অঙ্গীকার করে জড় জগতে সাধারণ মানুষের মতো লীলা করে ছিলেন। তিনি তাঁর পিতার দেহ ত্যাগের পর গয়াধামে গিয়ে পিন্ডদান ও তর্পন করে ছিলেন। যদি কোন ব্যাক্তি যথাবিধি পিন্ডদান ও তর্পণ অক্ষম হন তবে তার জন্য মহালয়ার পিতৃপক্ষের সুযোগ শাস্ত্রে প্রদান রয়েছে। তবে জেনে রাখা ভালো মহলয়ার দিনই পিতৃপক্ষের শেষ দিন। এ সময় যদি কেউ কোন কারণ বসত পিন্ডদান বা তর্পন করতে না পারেন তবে দীপাবলিতে পিতৃ পুরুষের পিন্ডদানে ও তর্পন করতে পারবেন।
মহামায়া যোগমায়াই হচ্ছে মহাদেবী দুর্গা। তিনি শুধু অসুরবধের সময় মুহাশক্তি চন্ডী রূপে বিষ্ণুর ইচ্ছায় মধুকৈটভ কে বধ করেন। ক্রেতা যুগে রাবন বধের জন্য রাম অকাল, বোধন করেন। মহালয়ার দেবীর মঙ্গলঘট স্থাপন করা হয়। বেল গাছ তলায় ষষ্ঠী তিথি পর্যন্ত ঘটের মাধ্যমে পূজা হয়। শ্রাবণ থেকে পৌষ এই ছয় মাস দক্ষিণায় দেব লোকে রাত্রি দেবগন এ সময় নিদ্রিত থাকেন। কৃত্তিবাস রামায়ণে বর্ণিত ঘটনায় অকাল বোধন উল্লেখ রয়েছে।
মহাদেবী কে যারা মহামায়া রূপে পূজা করেন তারা মায়ার জগতে ধন ঐশ্বর্যে, মায়া মমতায় জড়িয়ে পরেন। গীতায় অর্জুন বিষাদ যোগে, অর্জুন যুদ্ধ করতে কুরুক্ষেত্রে উপনিত হয়ে ও তিনি মহামায়ার প্রভাবে প্রভাভিত হয়ে ছিলেন এবং স্বজন বধ করে মহা পাপ গ্রহন করতে চাননি। পরিশেষে শ্রীকৃষ্ণ চরণে আত্ম নিবেদন করে তাঁর কৃপায় মহামায়ার প্রভাব থেকে মুক্ত হন। অর্জুন যোগমায়া যোগেশ্বরীর শ্রীপদে কৃপা প্রার্থনা করেন। মহাচ্ছন্ন না হয়ে ভগবান শ্রী কৃষ্ণের ইচ্ছায় কর্ম সাধনে এগিয়ে আসাই মনুষ্য জীবনের ব্রত হওয়া উচিত। অজ্ঞতার অন্ধকার এক মাত্র মহামায়া দূর্গা দেবীই দুর করতে পারেন।
ব্রহ্মবৈবর্ত পুরানে বলা হয়েছে কৃষ্ণ বহির্মুখ হলেই জীব ত্রিতাপ দুঃখ ভোগ করে। দুর্গাদেবী হরিভক্তি পরায়ণ জীবদের প্রতি তিনি দূর্গতি নাশিনী। দুর্গা পূজার প্রকৃত সময় বসন্তকাল। বসন্তকালে রাজ্যহারা রাজা সুরথ দুর্গা পূজা করেন। ব্রহ্মবৈবত পূরানে মেধা মুনির কৃপায় সমাধি বৈশ্যকে দেবী কৃষ্ণ মন্ত্র দান করেন। এতে তারা তাদের ত্রিতাপ দুঃখ থেকে মহা মুক্তি লাভ করেন। স্বামী বিবেকানন্দ মায়ের মন্দিরে গিয়ে বিষয় আসয় চাইতে পারেন নি। তিনি ভক্তি জ্ঞান বৈরাজ্ঞ চেয়ে ছিলেন।
শ্রীমদ্ভাগবতে (১০.২২.০৪) বলা হয়েছে, হে মহা দেবী কাত্যায়ণী (দুর্গা) হে ভগবানের মহাশক্তি, হে মহা যোগশক্তি ধারিনী, শক্তি মালিনী, সর্ব নিয়ন্তা, কৃপা করে নন্দ মহা রাজের পুত্র শ্রী কৃষ্ণকে আমার পতি করে দাও। সাধারণ মানুষ দুর্গা পূজা করে কোন জাগতিক লাভের আশায় কিন্তু গোপীগণ কৃষ্ণকে লাভ করার আশায় দুর্গা পূজা করে ছিলেন। দুর্গা দেবী হলেন কৃষ্ণের বহিরাঙ্গ শক্তি। শক্তি, শক্তি মানের ভেদ নেই।
স্কন্দ পুরানের মাহেশ্বর খন্ডে বলা হয়েছে, এক সময় দেবতাদের সঙ্গে অসূরদের ভয়ংকর যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে দেবতারা পরাজিত হয়ে স্বর্গ চ্যুত হন। তখন দেবতারা ব্রহ্মাকে অগ্রবর্তী করে শিব ও বিষ্ণুর সমপবর্তী হলেন। দেবতাদের মুখে মহিষাশুরের দৌরাত্ম্য বর্ণনা করেন। বিষ্ণুর নিদের্শে দেবতাগন তাদের সবার শক্তি একত্রীভূত করলেন। বিষ্ণু, শিব ও ব্রহ্মার মুখ মন্ডল’ থেকে তেজ নির্গত হলো। সৃষ্টি হলো একনারী মুর্তি। বিষ্ণুর তেজে তাঁর বাহু সমূহ, ব্রহ্মার তেজে তাঁর পদযুগল, শিবের তেজে দেবীর মুখ মন্ডল সৃষ্টি হলো। ইন্দ্রের তেজে তাঁর শরীর, বরুনের তেজে তাঁর বক্ষ্য ও উরুদ্বয় এভাবেই মহাশক্তি দূর্গা রূপে প্রকাশিত হলেন। দেবতারা তাদের দেয়া নিজ নিজ অস্ত্র থেকে এক একটি অস্ত্র নির্মান করে দেবীকে প্রদান করলেন। দেবতা বিজয়ী মহিমাসুর মহাশক্তিময়ী দুর্গা দেবীর হাতে বধ হন।” আঘাত কর মা দশভুজা, যতই আঘাত করবে ততই পাবে রক্ত পূজা”। মহিমাসুরের অন্তিম প্রার্থনায় দেবীর পদ তলে মহিষাসুর পূজা পেয়ে আসছে। শ্রীশ্রীচন্ডী পূরাণে দেবীর বিস্তারিত ঘটনাবলি বর্ণনা রয়েছে। চন্ডীদাস বাসুলী দেবীর পূজা করে গোবিন্দের কৃপা লাভ করে ছিলেন। শক্তিমানের ইচ্ছায় শক্তি ক্রিয়াশীল হয়। শক্তির কখনো স্বতন্ত্র ইচ্ছা থাকতে পারে না। তেমনই সর্বশক্তিমান পরমেশ্বর শ্রী কৃষ্ণের বহিরঙ্গা মায়াশক্তি দুর্গাদেবী। শ্রী কৃষ্ণের ইচ্ছা ছাড়া স্বতন্ত্র ইচ্ছায় কিছুই করতে পারে না। ব্রহ্মসংহিতায় বলা হয়েছে ভগবানকে প্রাপ্ত হওয়ার উদ্দেশ্যে বা তার প্রতি ভক্তি লাভের জন্য কেউ যদি শক্তি পূজা করেন তাই যথার্থ শক্তি পূজা। শ্রীরাম প্রসাদ, শ্রীরাম কৃষ্ণদেব, শ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারি ভক্তির মাধ্যমে শক্তিময়ীর কৃপায় পরম পুরুষকে লাভ করে ছিলেন। মহা মায়ার মহা তত্ত্ব জানা সহজ কথা নয়। মহালায়ার মহাতত্ত্ব যদি জানতে বাসনা থাকে, তবে মেধামুনির স্মরণ নিতে হবে। মহালায়ায় মহাদেবীর সর্বত্র কৃপা বর্ষিত হোক। বিশ্ব হোক শান্তিময়। হরে কৃষ্ণ।
লেখক-
রণজিৎ মোদক
শিক্ষক, কবি ও সাংবাদিক
ফতুল্লা, নারায়ণগঞ্জ।
আপনার মন্তব্য প্রদান করুন...