শীত পেরিয়ে আসছে বর্ষা। যদিও পুরো বর্ষা আসতে আরো প্রায় ২/৩ মাস বাকী। তথাপি এখন থেকেই ফতুল্লাবাসীর মনে জলাবদ্ধতার আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে গত শনিবার সন্ধার পর ফতুল্লা সহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টি হওয়ায় ফতুল্লাবাসীর মাঝে এই আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। দীর্ঘ প্রায় দুই যুগেরও বেশী সময় ধরে তারা এই দূর্ভোগ পোহাচ্ছেন। যেকারনে প্রতি বছর বর্ষা আসার আগেই জলাবদ্ধতার ভয়ে তারা আঁতকে উঠেন। এবারও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। এখনই জলাবদ্ধতার আশংকায় তারা চিন্তিত হয়ে পড়েছেন।
ফতুল্লার লালপুর এলাকার বাসিন্দা কামাল হোসেন আনেকটা ক্ষোভের সহিত বলেন, প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমের পুরোটা সময় এই এলাকা পানির নীচে তলিয়ে থাকে। কোথাও হাঁটু পানি আবার কোথাও গলা সমেত পানির নীচে তলিয়ে থাকে। পরিস্কার পানি হলেও একটা কথা ছিল। জলাবদ্ধতা পানির পুরোটাই বিভিন্ন ডায়িং কারখানার ক্যামিক্যাল মিশ্রিত তীব্র দূর্ঘন্ধ যুক্ত রঙ্গিন পানি। এর সাথে পয় পানি মিলে একাকার। প্রতি বর্ষার পুরোটা সময় এই নোংরা পানির সাথে আমাদের বসবাস করতে হয়। যখন কয়েকদিন টানা বৃষ্টি হয় তখন অধিকাংশ বাড়ীঘরের নীচ তলা পানির নীচে তলিয়ে যায়। নৌকা ছাড়া কোন মানুষ অফিস আদালতে যেতে পারে না, মুসল্লীরা নামাজ পড়ার জন্য মসজিদে যেতে পারেন না, শিক্ষার্থীরা স্কুল কলেজে যেতে পারে না। যেকারনে বর্ষা আসার আগেই এই এলাকার ভাড়াটিয়ারা অন্যত্র চলে যায়। যেকারনে এই এলাকার প্রতিটা বাড়ীর মালিক আর্থিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্থ।
প্রায় একই দূর্ভোগের চিত্র তুলে ধরে কতুবপুর শাহী বাজার এলাকার বাসিন্দা ফজলু মিয়া বলেন, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের মধ্যে কতুবপুর একটি বিশাল এলাকা। এই নির্বাচনী আসনের প্রায় অর্ধেক ভোটার এই এলাকায় বসবাস করে। যেকোন জাতীয় নির্বাচনে যিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি এই কুতুবপুর থেকে সবচাইতে বেশী ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। অথচ দীর্ঘ প্রায় দুই যুগ ধরে এই এলাকার বাসিন্দারা জলাবদ্ধতার সাথে বসবাস করে আসছেন। এই আসন থেকে প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনে যারাই বিজয়ী হয়েছেন তারা প্রত্যেই জনগনের সাথে প্রতারনা করেছেন। প্রতিটি নির্বাচনের আগে জলাবদ্ধতা নিরসনের প্রতিশ্রুতি দিলেও বিজয়ী হবার পর কেউই কথা রাখেননি। যদিও পতিত আওয়ামী সরকারের সাংসদ শামীম ওসমান এই জলাবদ্ধতা নিরসনের ব্যপারে অনেক গালগল্প শুনিয়েছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনিও এর সমাধান দিতে ব্যর্থ হয়েছেন।
তবে ভুক্তভোগী অনেকে বলছেন, যেহেতু সহসা ডিএনডি মেগা প্রকল্পের কাজ শেষ হচ্ছে না সেহেতু ততদিন পর্যন্ত প্রশাসনের উদ্যোগে বর্ষা আসার আগেই ফতুল্লার প্রতিটি পাড়া মহল্লার খাল গুলো খনন করে পানি প্রবাহ স্বাভাবিক করতে হবে। অবশ্য প্রতি বর্ষা মৌসুমে ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে মাঝে মধ্যে এ কাজটি করা হয় তখনই, যখন জলাবদ্ধতার তীব্রতায় জনজীবন স্থবির হয়ে পড়ে, তার আগে নয়। অথচ এ কাজটি করা প্রয়োজন বর্ষার শুরুতে। এছাড়া কিছু কিছু অসাধু মৎস চাষ কারীদের কারনেও জলাব্ধতা তীব্র হয়ে থাকে। মাছ যাতে ঘের থেকে বেরিয়ে যেতে না পারে সে কারনে তারা বাঁধ দিয়ে পানি প্রবাহ আটকে রাখে। সুতরাং এই কাজটি যাতে কোন মৎস চাষী করতে না পারে, সে ব্যপারে প্রশাসনের কঠোর নজরদারী থাকতে হবে। এছাড়া উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন একাধিক পাম্প বসিয়ে বুড়িগঙ্গা নদীতে পানি ফেলার ব্যবস্থা করতে হবে। তবেই জলাব্ধতার অভিসাপ থেকে ফতুল্লাবাসী কিছুটা হলেও মুক্তি পাবে।
জানা গেছে, ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জবাসীকে জলাবদ্ধতা থেকে স্থায়ীভাবে মুক্তি দিতে সেনাবাহিনীর তত্ববধানে ২০১৭ সালে (ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-ডেমরা) তথা ডিএনডি’র মেগা প্রকল্পের কাজ শুরু করে তা ২০২০ সালে শেষ হবার কথা ছিল। কিন্তু সেনাবাহিনী এখনও সেই কাজ শেষ করতে পারেনি। এ কারনে ডিএনডি’র প্রায় ৩০ লাখ মানুষ জলাবদ্ধা নামক অভিসাপ থেকে মুক্তি পাচ্ছেনা, কবে মুক্তি পাবেন তাও নির্দিষ্ট করে কেউ বলতে পারছে না। যেকারনে বর্ষা আসার আগেই ফতুল্লাবাসী চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। তাই বর্ষা আসার আগেই এ ব্যপারে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে জেলা প্রশাসনের জরুরী হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ফতুল্লাবাসী।
আপনার মন্তব্য প্রদান করুন...