রণজিৎ মোদক : তৎকালীন পরাধীন ভারত বর্ষের চারণ কবি মুকুন্দ দাস, স্বাধীনতা পিয়াসী ভারত বাসীর উদ্দেশ্যে উদাত্ত্বকণ্ঠে গান গেয়েছিলেন, “পরোনা বিলেতি শাড়ী, ভেঙ্গে ফেলো কাঁচের চুড়ি”। তার এ গানের মধ্যে স্বদেশ প্রেমকে জাগ্রত করার আহ্বান ব্রিটিশের রাজত্বে বাস করে ব্রিটিশের তৈরি পোশাক বর্জনের ডাক কম সাহসের কথা নয়। দেশাত্ববোধ বা স্বজাতি প্রেম থাকলে, অন্তরে কঠিন সাহস জন্মে।
শুধু তাই নয় দেশ প্রেমের সাথে দেশ ও স্বজাতির উন্নয়নে কর্মকে সামনে এনে দাঁড় করিয়েছেন, ‘কর্মের যুগ এসেছে সবাই কাজে লেগে গেছে। আমরা কি হবো অবসান?’ আজ বিংশ শতাব্দির এ বিজ্ঞানের যুগে কর্মী আর কর্মের জয় গাঁথা সর্বত্র। উন্নয়নের দৌড় প্রতিযোগিতায় অলসতার কোন মূল্য নেই। অলসতার বিলাস কুঞ্জে যে সব জাতি সুখ নিদ্রায় নিদ্রিত হয়ে দিনযাপন করেছেন তাদের আজ অস্তিত্ব বিলিন হয়ে গেছে। হাজার হাজার প্রজাতির পশু পাখি খাদ্যাভাবে বিলিন হয়ে গেছে। এখনো যাচ্ছে, উজান গাঙ্গের ভাটির টান খুবই ভয়াবহ এবং বেদনাদায়ক। ফকির রাজা হওয়ার আনন্দের চেয়ে, রাজা ফকির হওয়ার বেদনা, কষ্ট সহ্যের নয়।
এদিকে ফকির লালন শাহ্ তাঁর আধ্যাতিক জীবনের শেষ পরিণতির কথা চিন্তা করে গেয়েছেন, ‘সময় গেলে সাধন হবে না। অসময়ে কৃষি করে মিছামিছি জল সিটালে তাতেও কোন ফল হবে না।’ এই বাংলা গানের বাংলা সহজ সরল কথাগুলো অনেকের কানে পৌঁছায়নি। আশিকে দেওয়ানা হয়ে অনেকেই মাবুদ স্রষ্টার পথে নিজকে বিলিয়ে দিয়েছেন। ছোট্ট ছনের ঘর ছেড়ে মহান স্রষ্টার বিশাল ঘরের মেহমান হয়ে দ্বারে দ্বারে প্রেম বিলিয়ে যাচ্ছেন। এ প্রেমের রশিক সবাই হয় না। এই সে রস সবার ভাগ্যে মিলেওনা। কথায় আছে কাম ছাড়া প্রেম হয় না, আর কাম থাকলে প্রেম মেলে না। কঠিন কথায় নাই বা গেলাম।
যারা নেতা নেতৃত্বের লোভে রাজনীতি করেন তারা জনগণের শ্রদ্ধাহীনতার শিকার হন। মাটি ও তার মানুষকে যারা ভালবেসেছেন। তারা অমরত্বের দাবীদার। ভাবের জগৎ বাদ দিয়ে বাস্তব জগতের কথা যদি বলি তবে এ জগতের সাথে আমরা সবাই পরিচিত। পরিচিত জগতে স্বার্থের টানে অনেকেই অপরিচিত হয়ে যায়। সেই সত্য কথাটিই ‘এতটুকু আশা’ ছায়াছবিতে শুনতে পাই। ‘তুমি কি দেখেছ কভু জীবনের পরাজয়! দুঃখের দহনে করুন রোধনে তিলে তিলে তার ক্ষয়। স্বার্থের টানে প্রিয়জন কেন দূরে সরে রয়।’ সমাজে চার প্রকার অন্ধ দেখা যায়। এক জন্মান্ধ, জ্ঞানান্ধ, ধর্মান্ধ ও চতুর্থ স্বার্থান্ধ। মহাভারতের জ্ঞানান্ধ ধৃতরাষ্ট্র শুধু জন্মান্ধই ছিলেন না। তিনি পুত্র স্নেহে স্বার্থান্ধ হয়ে পরে ছিলেন। আর এ কারণেই কুরুক্ষেত্রের মহাযুদ্ধে তাঁর শত পুত্র হারা হন। চানক্যের ভাষায় সৎ পুত্র কুলের ভূষন। পিতা-মাতা সন্তানের যেমন বন্ধু তেমনই পরম শত্রু। যে পিতা-মাতা তার সন্তানকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলেন। সেই পিতা-মাতা সন্তানের বন্ধু। আর যে পিতা-মাতা তার সন্তানকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে অক্ষম, সেই পিতা-মাতা তার সন্তানের পরম শত্রু বলে বিবেচিত হন।
প্রতিটি পিতা-মাতাই চান তার সন্তানকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করতে। কিন্তু কারো ভাগ্যে জোটে কারো ভাগ্যে জোটে না। পরিবেশ পরিস্থিতি অনেক সময় অন্তরায় হয়। আমার জানামতে বেসরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ের জনৈক সহকারী প্রধান শিক্ষক তার মেধাবী মেয়েকে অর্থাভাবে মেডিক্যালে ভর্তি করতে পারেননি। জীবন ভর সততার শিক্ষকতা করে পরের সন্তানকে আপন সন্তান জ্ঞানে শিক্ষা দান করেছেন। অর্থ কষ্টে ভুগেছেন। কিন্তু কোনদিন আল্লাহ্ ছাড়া কারো কাছে তিনি কিছু চাননি। একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে শুধু নিজের অক্ষমতাকে দায়ী করলেন। জানি ভাগ্য বিধাতা তার এ দীর্ঘশ্বাস কেমন ভাবে নিবেন। লোকে বলে, ‘লেখাপড়া করে যে গাড়ি ঘোড়ায় চড়ে সে’। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের সার্টিফিকেট নিয়ে শিক্ষকতা করছেন। তার ভাগ্যে কবে সেই ভাগ্যের রাজ মুকুট জুটবে। হয়তো শিক্ষকতা। জীবনের অবসরকালে ছোট-বড় একটা বিদায় অনুষ্ঠান করা হবে। এইতো এদেশের শিক্ষকদের ভাগ্যে যা জোটে তাই বলছি।
সেদিন আমার এক ছাত্রের সাথে দেখা। রাস্তা দিয়ে যাওয়ার পথে দূরে থেকে আমাকে দেখে এগিয়ে এসে ছাত্র সুলভ ভঙ্গীতে সালাম জানালো। স্যার আমাকে চিনতে পারছেন? বললাম হ্যা, তোমাকে চিনতে পারছি। তোমার নাম শ্যামল না? জ্বী স্যার। বললাম বর্তমানে কি করছো? লাজনত ভাবে অপরাধীর ন্যায় বললো স্যার! মাস্টার্স পাশ করে বেকার অবস্থায় আছি। চাকরীর জন্য অনেক চেষ্টা করছি কিন্তু কিছুই করতে পারছি না। ওকে তেমন কোন শান্তনা দিতে পারিনি। লাখ লাখ শিক্ষিত বেকারের দেশে, এখানে কি বলার আছে। এই দেশের হাজার হাজার শিক্ষিত বেকার যুবক পিতা-মাতার ভিটাবাড়ির মাটি বিক্রি করে বিদেশে চাকুরীর সন্ধানে সর্বশান্ত হয়ে ফিরে আসছে। অনেকে ঋণ করে মহাঋণের শিকার হচ্ছে। এক সময় বলা হতো যার নাই কোন গতি সে করেন পন্ডিতি। আজ পন্ডিতি (শিক্ষক) চাকুরীর মধ্যে ও নিবন্ধন নীতির বিড়ম্বনার শিকার অনেকেই। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের সার্টিফিকেট প্রাপ্তকে আবার নিয়ন্ত্রনের মাধ্যমে সরকারি-বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চাকরী নিতে হচ্ছে। এখানেই শেষ নয় আরও কিছু ডট ডট রয়েছে। চাকরী এখন বাবা সোনার হরিণ।
সেন, মোগল, পাঠান ব্রিটিশ, পাক আমলের শিক্ষার কথা বলছি না। সে সময় অতীশদীপংকর স্যার, জগদীশ চন্দ্র বসু, ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর। মাইকেল মধুসুধন দত্ত, স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, ড. শহীদুল্লাহ্, ডা. বিধান চন্দ্র রায়ের কথা এসে যায়। বর্তমান বাংলাদেশে কেজি কেজি পড়ানো হচ্ছে। এক কেজি দুই কেজি। কেজি ওয়ান কেজি টু করে করে একেবারে দ্বাদশ শ্রেণী। প্রতি বছর লাখ লাখ বেকার বেড়িয়ে আসছে। না কোন মিল ইন্ডাস্ট্রি থেকে নয়! কলেজ বিদ্যালয় নামের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে। এসব দৃশ্যপট দেখেই বিশ্ব বরেণ্য চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায় তাঁর পুরস্কারপ্রাপ্ত ‘হিরক রাজার দেশে’। যন্ত্রর মন্ত্রর ঘরের প্রতিষ্ঠাতা হিরক রাজা প্রচার করলেন ‘লেখাপড়া করে যে অনাহারে মরে সে’। হিরক রাজা যাই বলুক শিক্ষার বিকল্প নেই। আর প্রকৃত শিক্ষিত জন না খেয়ে মরেন না। সুধীজন বলেন, যতই করিবে দান, ততই বৃদ্ধি পাবে। চোরে না চুরি করতে পারে, কারো বিদ্যাধন।
‘পুঁথিগত বিদ্যা আর পরহস্থে ধন’ ধন এবং জ্ঞান মানুষের জীবনে দুটোই প্রয়োজন। তবে ধন থাকলেই জ্ঞান অর্জন সম্ভব নয়। অনেক ধর্নাঢ্যের ঘরের দুলালকে রত্ন বানানোর চেষ্টা করেও অনেকে ব্যর্থ হয়েছেন। তাদের দুঃখের কথা যাই হোক পুঁথিগত বিদ্যা দিয়ে জীবনের মোড় ঘুরবে না বলে মন্তব্য করেছেন বর্তমান শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিষ্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল।
তিনি বলেন, আমাদের অর্থনীতিতে এখন শুধুমাত্র অনার্স, মাস্টার্স, এম.এ, বি.এ পাশ করলেই কর্ম স্বার্থবল অর্জন সম্ভব নয়। পুঁথিগত বিদ্যা দিয়ে জীবনের মোড় ঘুরবে না। উচ্চশিক্ষা অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণ নিতে হবে। উচ্চশিক্ষা মনকে উচ্চতর উন্নত ও চিন্তার গভীরতা বাড়াবে, কিছুটা দক্ষতা দিবে। সুশিক্ষিত মানুষ হিসেবে সবাইকে মাথায় রাখিতে হবে পৃথিবীর কোন পোস্টই কোন কাজই অসম্মানের নয়। উচ্চমানের প্রশিক্ষন নিয়ে আমাদের ছেলে-মেয়েরা ঘরে বসেই বিদেশ থেকে উপার্জন করার সক্ষমতা অর্জন করতে পারবে।
যাইহোক এখন কথায় আসি, আমাদের দেশে এক শ্রেণীর মানুষ সর্বত্র হতাশার পাখা দিয়ে দুঃখের আগুনে বাতাস করে করে হতাশা ছড়িয়ে বেড়াচ্ছে। বর্তমানে জীবন জীবিকার মান যে বৃদ্ধি পেয়েছে সে কথা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে। এক কথায় মানুষের বয়সের গড় আয়ু ৭২.৮% বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থাৎ নৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং দেশে দারিদ্রতার হার ২০.৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। ঔষধ ও সিমেন্ট শিল্প ঐতিহাসিক উন্নয়নের স্বাক্ষ্য। বিগত বছরগুলোতে ৩০টি দেশ থেকে নির্মাণ কাজে সিমেন্ট আমদানী করা হতো। বর্তমানে আমাদের দেশ থেকে বিদেশে সিমেন্ট রফতানী শুরু হচ্ছে। তাছাড়া আমাদের দেশের তৈরি জীবন রক্ষাকারী ঔষধ প্রায় ২০/২৫টি দেশে রফতানী করা হচ্ছে।
টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতা গ্রহণের পর আওয়ামী লীগ সরকারের এক বছর পূর্তি হলো ৭ জানুয়ারী ২০২০ইং। চতুর্থ বছরের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু কন্যা দেশরত্ন জননেত্রী শেখ হাসিনা। বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই এক বছরে দেশের সার্বিক উন্নয়নে বেশ কিছু সফলতা দেখিয়েছে সরকার। পদ্মাসেতু সহ প্রায় ডজন খানেক বড় বড় প্রকল্প সময় মতো শেষ করার লক্ষ্যেই দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে কাজ। বর্তমানে দেশে ২২ হাজার ৭৬৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে। ৯৫ শতাংশ জনগোষ্ঠী বিদ্যুৎ সুবিধার আওতাভূক্ত।
এছাড়াও ‘আমার গ্রাম আমার শহর’ ও আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইস্তেহারের অন্যতম কর্মসূচীর কাজ এগিয়ে যাচ্ছে। হতাশার বাণী যে যাই শুনাক আমরা আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কণ্ঠে শুনেছি, তিনি প্রতিটি পরিবার থেকে একজন করে কর্ম সংস্থাপনের ব্যবস্থা করে দিবেন। তিনি যে আন্তরিকভাবেই দেশ ও দেশের জনগনের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। দারিদ্রবিমোচন, স্বাস্থ্য, নিরাপদ সড়ক, রেলপথ ও বিমান পথে যোগাযোগের অভূতপূর্ব উন্নয়ন ঘটছে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপনের মাধ্যমে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন পূরণের পথে অনেক দূর এগিয়েছে বাংলাদেশ।
লেখক –
রণজিৎ মোদক
শিক্ষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট
সভাপতি, ফতুল্লা রিপোর্টার্স ক্লাব
মোবাইল : ০১৭১১৯৭৪৩৭২
আপনার মন্তব্য প্রদান করুন...