গত জানুয়ারি মাসে থার্টিফার্স্ট নাইট উদযাপন উপলক্ষে ৩১ ডিসেম্বর দুপুরে টানবাজার সিটি কলোনিতে বিশেষ অভিযান চালিয়ে দেশি-বিদেশি মিলিয়ে ৫০ লিটারের বেশি মদ উদ্ধারসহ গোবিন্দ দাসকে গ্রেপ্তার করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। অভিযোগ রয়েছে, এরপর সাময়িকভাবে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (নাসিক) পরিচ্ছন্নকর্মীর চাকরি থেকে অব্যাহতি পেলেও মোটা অঙ্কের উৎকোচের বিনিময়ে তিনি পুনরায় চাকরিতে বহাল হন এবং আগের মতোই মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। এমন অভিযোগ করেছেন নাসিকে কর্মরত কয়েকজন পরিচ্ছন্নকর্মী। তাদের দাবি, এ ঘটনায় নাসিকের সচিবের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিন নারায়ণগঞ্জের অন্তত দুটি বৈধ মদের দোকান থেকে বিপুল পরিমাণ মদ সংগ্রহ করে মেথরপট্টির কয়েকজন চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী শহরের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করতেন। তাদের মধ্যে গোবিন্দ দাস অন্যতম বলে দাবি স্থানীয়দের।
স্থানীয়দের ভাষ্য, নারায়ণগঞ্জ থানা ও টানবাজার পুলিশ ফাঁড়ি থেকে মাত্র কয়েক গজ দূরত্বে দীর্ঘদিন ধরে এই অবৈধ কার্যক্রম চললেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, টানবাজার পুলিশ ফাঁড়ি ও নারায়ণগঞ্জ সদর থানার কনস্টেবল থেকে শুরু করে দারোগা ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নিয়মিত মাসোহারা দিয়ে গোবিন্দ ও তার সহযোগীরা নির্বিঘ্নে মাদক ব্যবসা চালিয়ে আসছিলেন। তবে এ অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয়দের দাবি, এর ফলে এলাকাটি কার্যত একটি ‘ওপেন ড্রাগ জোনে’ পরিণত হয়েছে, যেখানে আইন প্রয়োগ কার্যত অকার্যকর। একই সঙ্গে টানবাজারের সেন অ্যান্ড কোম্পানির কর্ণধার গিয়াস উদ্দিন রুবেলের নামও আলোচনায় এসেছে।
অভিযোগ রয়েছে, গিয়াস উদ্দিন রুবেলের তত্ত্বাবধানে গোবিন্দ ও তার সহযোগীরা দীর্ঘদিন ধরে ভেজাল ও চোরাই মদের একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক পরিচালনা করে আসছেন। আরও অভিযোগ, থানা পুলিশ, ডিবি, পুলিশ সুপারের কার্যালয়সহ বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলকে ‘ম্যানেজ’ করে তারা নিজেদের ধরাছোঁয়ার বাইরে রাখছেন। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গোবিন্দ দাসের মাদক চক্রের অন্যতম নেতৃত্বে রয়েছেন টানবাজারে সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নকর্মীদের সংগঠন ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সভাপতি শিমুল। একই সিন্ডিকেটে রয়েছেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক কিশোর, সুমনসহ আরও কয়েকজন। তাদের মধ্যে একজন এনসিসির ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের পরিচ্ছন্নকর্মী এবং ডন চেম্বারে অবস্থিত বেসরকারি হাসপাতাল মেডিস্টারে চাকরি করেন বলে দাবি করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন সময়ে মদসহ পুলিশের হাতে আটক হলে তিনি মেডিস্টারের পরিচয়পত্র (আইডি কার্ড) ব্যবহার করে সুবিধা নিতেন। অন্যদিকে শিমুল এনসিসির ১২ নম্বর ওয়ার্ডের পরিচ্ছন্নকর্মী হিসেবে কর্মরত।
স্থানীয়দের আরও দাবি, ২০২১ সালে বিপুল পরিমাণ মদসহ গোবিন্দ দাস পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হলেও তার কথিত মাদক সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে থাকা শিমুল ও কিশোর তখন পলাতক ছিলেন।
নাসিকে কর্মরত কয়েকজন পরিচ্ছন্নকর্মী জানান, গোবিন্দ একজন পেশাদার মাদক ব্যবসায়ী। শুধু গত বছরের ডিসেম্বরেই নয়, এর আগেও একাধিকবার ডিবি পুলিশ ও থানা পুলিশের হাতে চোলাই মদসহ গ্রেপ্তার হয়েছেন তিনি। তবে ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের প্রভাবশালী নেতাদের ছত্রচ্ছায়ায় থাকায় প্রতিবারই তিনি সহজে পার পেয়ে যান বলে তাদের অভিযোগ।
তাদের ভাষ্য, গত ডিসেম্বরে ডিএনসির অভিযানে ৫০ লিটার মদসহ আটকের পর গোবিন্দকে নাসিকের পরিচ্ছন্নকর্মীর পদ থেকে বাদ দেওয়া হয়। পরে জামিনে মুক্ত হয়ে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে পুনরায় একই পদে নিয়োগ পান বলে তারা অভিযোগ করেন। এমনকি গোবিন্দ নিজেও বিভিন্ন পরিচ্ছন্নকর্মীর সামনে বিষয়টি প্রকাশ্যে বলে বেড়ান বলেও দাবি করেন তারা।
পরিচ্ছন্নকর্মীদের প্রশ্ন, বারবার মাদকসহ আটক হওয়ার পরও কীভাবে গোবিন্দ পুনরায় নাসিকের পরিচ্ছন্নকর্মী হিসেবে বহাল থাকেন? তাদের অভিযোগ, নাসিকের কিছু অর্থলোভী কর্মকর্তাকে মোটা অঙ্কের অর্থ দিয়ে ‘ম্যানেজ’ করেই তিনি একই অপরাধ বারবার করেও চাকরিতে বহাল থাকতে সক্ষম হয়েছেন।
স্থানীয়দের দাবি, শহর ও শহরতলীতে গোবিন্দ একজন আলোচিত মাদক ব্যবসায়ী। তিনি একাধিকবার মাদকসহ গ্রেপ্তার হয়েছেন এবং তার বিরুদ্ধে একাধিক মাদক মামলা রয়েছে। এমন একজন ব্যক্তিকে কীভাবে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নকর্মী হিসেবে বহাল রাখা হয়েছে—এ প্রশ্ন তুলে নাসিক প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন অন্যান্য পরিচ্ছন্নকর্মীরা।
তারা অবিলম্বে আলোচিত এই মাদক ব্যবসায়ী গোবিন্দ দাসকে নাসিকের পরিচ্ছন্নকর্মীর পদ থেকে বরখাস্ত করার দাবি জানান। তবে প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হবে।
আপনার মন্তব্য প্রদান করুন...