নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার ইসদাইর এলাকায় মাদক ব্যবসা ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডকে ঘিরে ফের উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অপরাধী চক্রের তৎপরতা থাকলেও মাদক কারবারকে কেন্দ্র করে এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতা থামেনি। বর্তমানে রাজ্জাক ও তার সহযোগীদের একটি গ্রুপ মাদক ব্যবসা ও এলাকার নিয়ন্ত্রণে সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সর্বশেষ শনিবার (১৫ আগস্ট) দুপুর ৩টার দিকে চাষাঢ়া রেলস্টেশনসংলগ্ন পূর্ব ইসদাইরে মাদকবিরোধী অভিযানকে কেন্দ্র করে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পুলিশ জানিয়েছে, অভিযানে বাধা দেওয়ার পাশাপাশি পুলিশের ওপর ইট-পাটকেল নিক্ষেপ এবং গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ব্যবস্থা নিলে রাজ্জাকের ছেলে জসিম গুলিবিদ্ধ হন। ঘটনাস্থল থেকে জসিম ও তার সহযোগী মোহনকে একটি বিদেশি পিস্তলসহ গ্রেপ্তার করা হয়।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, ইসদাইরে মাদককে ঘিরে অপরাধের বিস্তার অনেক দিনের। মাদক কারবারের পাশাপাশি ছিনতাই, ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা, চাঁদাবাজি, মারামারি, অপহরণ ও গোলাগুলির মতো ঘটনাও বিভিন্ন সময়ে ঘটেছে। গত পাঁচ বছরে মাদক ব্যবসাকে কেন্দ্র করে ২০টির বেশি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলেও স্থানীয়দের দাবি। তবে এসব হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে মাদক ব্যবসার সম্পৃক্ততার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ায় যাচাইয়ের বিষয়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, মাদকের বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে একটি অপরাধী গ্রুপের হাতে এলাকায় বড় ধরনের প্রভাব তৈরি হয়। সেই প্রভাব কাজে লাগিয়ে চাঁদাবাজি, ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ ও অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ তৈরি হয়। ফলে মাদকের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে একাধিক পক্ষের মধ্যে বিরোধ ও সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ইসদাইরের অপরাধ জগতের আলোচনায় নাহিয়ান আজম ইভনের নাম উঠে আসত। স্থানীয়দের দাবি, তিনি আজমেরী ওসমানের অনুসারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। একই সময়ে ‘ফারুক বাহিনী’ নামেও একটি গ্রুপের তৎপরতার কথা স্থানীয়ভাবে আলোচিত ছিল। ২০২৫ সালের ৭ নভেম্বর প্রতিপক্ষের হামলায় ইভন নিহত হওয়ার পর তার নেতৃত্বাধীন গ্রুপের তৎপরতা অনেকটাই কমে যায় বলে স্থানীয়রা জানান।
এরপর ইসদাইর এলাকায় মাদক ব্যবসা ও আধিপত্য বিস্তারের ক্ষেত্রে রাজ্জাক এবং তার সহযোগীদের তৎপরতা দৃশ্যমান হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, রাজ্জাকের পাশাপাশি তার পরিবারের কয়েকজন সদস্যও বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে রাজ্জাক কিংবা তার পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
রাজ্জাক ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানও হয়েছে। গত এপ্রিল মাসে মাদকবিরোধী অভিযানে রাজ্জাক ও তার ছোট ছেলে মো. ওয়াসিমকে (২২) ৫৩ রাউন্ড গুলিসহ গ্রেপ্তারের কথা জানায় পুলিশ। এর আগে ঢাকার বিমানবন্দর এলাকা থেকে আগ্নেয়াস্ত্রসহ রাজ্জাকের আরেক ছেলে জসিমকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
স্থানীয়দের দাবি, জামিনে বের হয়ে আসার পর রাজ্জাক ও তার দুই ছেলে ফের এলাকায় সক্রিয় হন। এতে প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপগুলোর সঙ্গে বিরোধ আরও তীব্র হয়ে ওঠে। গত ৭ আগস্ট ইসদাইর রেললাইন এলাকায় দুই পক্ষের মধ্যে প্রকাশ্যে গোলাগুলির ঘটনাও ঘটে বলে স্থানীয়রা জানান।
এলাকার ব্যবসায়ী আরিফ রহমান বলেন, ‘অপরাধীরা বড় ধরনের অপরাধে জড়ানোর পরও কিছুদিনের মধ্যে জামিনে বের হয়ে আবার এলাকায় সক্রিয় হয়ে ওঠে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়।’
তিনি বলেন, ‘ইসদাইরে একাধিক অপরাধী গ্রুপ রয়েছে। শুধু অভিযান চালালেই হবে না, অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।’
নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) তারেক আল মেহেদী বলেন, ‘ইসদাইরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দ্রুতই সব অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা হবে।’
স্থানীয়দের আশঙ্কা, মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে গ্রুপগুলোর বিরোধ আরও সংঘাতপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তাদের মতে, নিয়মিত মাদকবিরোধী অভিযান চালানোর পাশাপাশি অবৈধ অস্ত্রের উৎস, মাদক কারবারের অর্থের জোগান এবং অপরাধী চক্রের পেছনে থাকা ব্যক্তিদের শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। এতে ইসদাইরে দীর্ঘদিনের অপরাধপ্রবণতা কমিয়ে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন তারা।
আপনার মন্তব্য প্রদান করুন...