নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লার লামাপাড়া শিবু মার্কেট এলাকার ঐতিহ্যবাহী দরগাহ বাড়ি জামে মসজিদ, পঞ্চায়েত ও কবরস্থান কমিটির অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে বাবুল-হেনা গংয়ের বিরুদ্ধে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, একসময় আর্থিক সংকটে দিন কাটানো দুই পরিবারের সদস্যরা বর্তমানে বিপুল সম্পদ ও একাধিক বহুতল ভবনের মালিক। মসজিদ, পঞ্চায়েত ও বাজার থেকে আদায়কৃত অর্থের অনিয়মের পাশাপাশি স্থানীয় বাড়ির মালিকদের বিভিন্নভাবে চাপে রেখে সম্পত্তি হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একসময় লামাপাড়ায় টিনের ঘরে বসবাস করতেন বাবুল মিয়া। পরিবারের জীবিকা নির্বাহে তিনি মাটি কেটে ট্রাকে করে বিভিন্ন ইটভাটায় বিক্রি করতেন বলে জানান স্থানীয়রা। অন্যদিকে হেনা মিয়া এলাকায় ছোটখাটো জমি-জমার দালালি করতেন। পরবর্তীতে দুই পরিবারের মধ্যে আত্মীয়তার সম্পর্ক তৈরি হলে এলাকায় তাদের প্রভাব ও কর্মকাণ্ড আরও বিস্তৃত হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, লামাপাড়ায় নতুন কেউ জমি কিনে বাড়ি নির্মাণ করতে গেলে বিভিন্ন কৌশলে তাদের চাপে ফেলা হতো। বাড়ির চলাচলের রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ নিয়ে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করাসহ নানা হয়রানির মাধ্যমে বাড়ির মালিকদের অতিষ্ঠ করে তোলা হতো বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। একপর্যায়ে অনেকেই বাধ্য হয়ে কম দামে বাবুল-হেনা সংশ্লিষ্টদের কাছে বাড়ি-জমি বিক্রি করে এলাকা ছাড়তেন বলে দাবি স্থানীয়দের।
এদিকে বাবুলের ছেলে রনি ও তার ভাই আবদুল্লাহকে ঘিরেও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, রনি আওয়ামী তরুণ লীগের ফতুল্লা শাখার সভাপতি থাকাকালে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করতেন। তার বাসায় ‘সোহেল’ নামে এক ভাড়াটিয়াকে আশ্রয় দিয়ে মাদক ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগও রয়েছে। একই সঙ্গে আবদুল্লাহর বিরুদ্ধেও মাদক ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রনি বর্তমানে বিএনপির বিভিন্ন নেতাকর্মীর সঙ্গে ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করছেন এবং নিজেকে দলটির ঘনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে পরিচিত করার চেষ্টা করছেন। তবে এসব রাজনৈতিক ও মাদকসংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে দরগাহ বাড়ি জামে মসজিদ, পঞ্চায়েত ও বাজারের অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে। স্থানীয় মুসল্লিদের অভিযোগ, এসব প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতি মাসে বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায় হলেও দীর্ঘদিন ধরে তার স্বচ্ছ হিসাব দেওয়া হয়নি। মসজিদ কমিটি থেকে নিজেদের জন্য মোটা অঙ্কের সম্মানী বা বেতন নেওয়ার পাশাপাশি তারাবির নামাজে অনভিজ্ঞ স্বজনদের দায়িত্ব দিয়ে তাদের মাধ্যমে মোটা অঙ্কের হাদিয়ার অর্থ ভাগাভাগি করে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
স্থানীয় মুসল্লিদের দাবি, দীর্ঘ প্রায় ৩০ বছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব চাওয়া হলে বিষয়টি নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। অভিযোগ রয়েছে, হিসাব-নিকাশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মসজিদের এক ম্যানেজারকে আত্মগোপনে পাঠিয়ে তার নামে থানায় নিখোঁজের সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। পরবর্তীতে ওই ম্যানেজারের সন্ধান পাওয়া গেলে তার ব্যাংক হিসাবে প্রায় ৫০ লাখ টাকা থাকার তথ্য সামনে আসে বলে স্থানীয়দের দাবি। তবে ব্যাংক হিসাবের এই তথ্যের স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, মাটি কেটে জীবিকা নির্বাহ করা বাবুল এবং জমির দালালি করা হেনা বর্তমানে পাঁচ থেকে ছয়টি করে বহুতল ভবনের মালিক। তাদের সন্তানদের নামেও বিপুল সম্পদ গড়ে তোলা হয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের। মসজিদের জমি বিক্রি, দান-সদকা ও বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানের অর্থের ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের মাধ্যমে এসব সম্পদ গড়ে তোলা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তারা।
স্থানীয় মুসল্লিদের প্রশ্ন, দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অর্থের আয়-ব্যয়ের হিসাব নিয়ে অভিযোগ থাকার পরও কেন কার্যকর তদন্ত হচ্ছে না। তাদের দাবি, দরগাহ বাড়ি জামে মসজিদ, পঞ্চায়েত ও কবরস্থান কমিটির গত কয়েক দশকের আয়-ব্যয়ের হিসাব, ব্যাংক হিসাব, সম্পত্তির দলিল এবং জমি বিক্রির নথিপত্র নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে।
লামাপাড়ার ভুক্তভোগী মুসল্লি ও সাধারণ বাসিন্দারা সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রভাবমুক্ত করতে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন। একই সঙ্গে অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে অর্থ আত্মসাৎ, সম্পত্তি দখল কিংবা অনিয়মের সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
আপনার মন্তব্য প্রদান করুন...